অবশেষে হেলেনা জাহাঙ্গীর গ্রেফতার

আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটি থেকে বহিষ্কৃত আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) রাত আটটা থেকে তার গুলশানের ৫ নম্বর সড়কের ৩৬ নম্বর বাসায় অভিযান চালা‌য় র‍্যাবের একটি দল। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ১৭ বোতল বিদেশি মদ ও বিপুল ইয়াবা পাওয়া গেছে। এছাড়া হরিণের চামড়া ও ওয়াকিটকিও উদ্ধার করা রয়েছে। এসময় তার ব্যবহৃত দুটি অস্ত্র পাওয়া গেছে। তবে সেগুলোর বৈধ কাগজ রয়েছে।

 

র‌্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মাদক মামলা দায়ের করা হবে। এছাড়া আরও কয়েকটি মামলা হতে পারে। র‌্যাবের আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, অভিযানের সময় তার বাসায় বিপুল পরিমাণ মাদক ও হরিণের চামড়া পাওয়া গেছে। মাদকবিরোধী আইন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।

 

সম্প্রতি নেতা বানানোর ঘোষণা দিয়ে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামে একটি সংগঠন। এটির কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নাম আসে হেলেনা জাহাঙ্গীরের। আর সাধারণ সম্পাদক করা হয় মাহবুব মনিরকে। তাদের নাম-সংবলিত পোস্টার ফেসবুকে ভাইরাল হয়। পোস্টারে সংগঠনটির জেলা, উপজেলা ও বিদেশি শাখায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। সংগঠনটির দাবি, দুই-তিন বছর ধরে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে তারা। যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, সংগঠনটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই।

 

চাকরিজীবী লীগ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে গত শনিবার আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটি থেকে বাদ দেয়া  হয় হেলেনাকে। আর তাকে কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পদ থেকে আরও আগেই বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা। চাকরিজীবী লীগের বিষয়টি আলোচনায় আসার পর আওয়ামী লীগের নামের সঙ্গে মিল রেখে সংগঠন পরিচালনা করছে এমন অন্তত অর্ধশত সংগঠনের নাম আসে। এদের কেউ কেউ তাদের দলীয় প্যাডে ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেছে ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, যেটি আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, খুব শিগগির এসব ভুঁইফোঁড় সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীরের উত্থান হয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায় তার। হেলেনার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় জাহাঙ্গীর। স্বামীর সংসারে হেলেনা জাহাঙ্গীর পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন; শেষ করেন স্নাতকোত্তর। এরপর শুরু করেন তার উদ্যোক্তা জীবন।

 

তিনি একাধারে প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১২ হাজার কর্মী কাজ করছে এসব প্রতিষ্ঠানে। হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য ও নির্বাচিত পরিচালক। এ ছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএরও সক্রিয় সদস্য তিনি।

 

এফবিসিসিআইয়ের সদস্যপদ পাওয়ার এক মাসের মাথায় নির্বাচনে নেমে ও পরিচালক নির্বাচিত হয়ে আলোচনার জন্ম দেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। জয়যাত্রা নামে একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনেরও মালিক তিনি। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পুরস্কৃতও হয়েছেন রোটারি ক্লাবের একজন ডোনার হিসেবে।  ফেসবুকে ২ লাখের বেশি ফলোয়ার হেলেনা জাহাঙ্গীরের। রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে তার দাপুটে উত্থান ও পদচারণা। আওয়ামী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে তার জাতীয় পার্টিতে এবং তারও আগে বিএনপির রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যায়। গণমাধ্যমে ওই দুটি দলের প্রধান খালেদা জিয়া ও হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে ছবিও প্রকাশ পেয়েছে।

আরও পড়ুন: আইভীর বাসায় তৈমুর: জানালেন সমবেদনা

 

প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। তখন দাবি করতেন, তার কোনো রাজনৈতিক দল নেই। তিনি স্বতন্ত্র রাজনীতি করতে চান। যদিও পরে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমুলক সংগঠনগুলোর সঙ্গেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি প্রায় এক ডজন সামাজিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয় দায়িত্বে রয়েছেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব সেফায়েতুল্লাহ সেফুর (সেফুদা) সঙ্গে তার বিতর্কিত কথোপকথন সম্পর্কিত একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। একটি গণমাধ্যমের মালিকের সঙ্গে তিনি গান গাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছেন এমন দাবি সম্পর্কিত ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং এ বিষয়ে ওই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের পাল্টা কঠোর প্রতিবাদ ফলোয়ারদের মধ্যে তুমুল আলোচনার খোড়াক জোগায়। ফেসবুকেও প্রায়শ তার নানা ধরনের পোস্ট ও লাইভ নানাভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে।

 

হেলেনা জাহাঙ্গীরের জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে। উইকি ফ্যাক্টসাইডার নামের একটি ওয়েবসাইটে তার পেশা হিসেবে অ্যাংকর বা উপস্থাপক উল্লেখ করা হয়েছে। হেলেনার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম একজন ব্যবসায়ী। ১৯৯০ সালে তারা বিয়ে করেন। তিনি তিন সন্তানের জননী। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। সেই সূত্রে জন্ম কুমিল্লায় হলেও হেলেনা জাহাঙ্গীরের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী, সদরঘাট এলাকায়। পড়াশোনা স্থানীয় কৃষ্ণচূড়া স্কুলে। চাকুরি সূত্রে তার বাবা প্রমোশনাল প্রস্তাব পেয়ে রাশিয়ায় চলে গেলে মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি ফিরে যান হেলেনা।

 

এফবিসিসিআই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একাধিক গণমাধ্যমকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের দেয়া সাক্ষাৎকার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের সময় স্বামী জাহাঙ্গীর আলম নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠিত পোশাক কারখানার জিএম পদে চাকরি করতেন। পাশাপাশি সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসার সঙ্গেও সংশ্লিষ্টতা ছিল।

 

তবে গৃহিণী হিসেবে বসে না থেকে পড়াশোনা শেষ করে হেলেনা জাহাঙ্গীর শুরুতে চাকরির চেষ্টা করেন। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য ইন্টারভিউও দিয়েছেন তিনি। একদিন চাকরি খোঁজার সূত্র ধরে চলে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের অফিসে। সেখানে স্বামীর অফিস কক্ষ দেখে তিনি ঠিক করেন নিজেই উদ্যোক্তা হওয়ার। স্ত্রীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান স্বামী জাহাঙ্গীর আলম।

 

বিয়ের ৬ বছর পর ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মিরপুর ১১ তে একটি ভবনের দুটি ফ্লোর নিয়ে তিনি শুরু করেন প্রিন্টিং ও অ্যামব্রয়ডারি ব্যবসা। পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে নানান ধরনের পণ্যের জন্য লোগো ও স্টিকার প্রিন্ট করে এ প্রতিষ্ঠান। নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট লিমিটেড দিয়ে শুরু করে জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় একে একে হেলেনা গড়ে তোলেন জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড, জেসি এমব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং এবং হুমায়রা স্টিকার লিমিটেড, যার সবকটিরই ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি।

 

হেলেনা জাহাঙ্গীর গুলশান ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গলফ ক্লাব, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলশান জগার্স সোসাইটি ও গুলশান হেলথ ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মন্তব্যসমূহ (০)


Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন